রাজশাহীতে শাহমখদুম মেডিক্যাল কলেজ বন্ধে স্বস্তি শিক্ষার্থীদের মাঝে

সৌমেন মন্ডল, রাজশাহী ব্যুরোঃ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা লঙ্ঘন করায় রাজশাহীর শাহ মখদুম মেডিক্যাল কলেজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দফায় ২২৫ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এ প্রতিষ্ঠানটিতে।

চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশন করার নির্দেশ দেওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে তাঁদের মাঝে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এখনো যারা এমবিবিএস শেষ করতে পারেননি তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ অন্য বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মাইগ্রেশন করার ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত ২ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রাণলয়ের উপসচিব বদরুন নাহার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। এর আগে গত ২৫ অক্টোবর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের চক্রান্তের প্রতিবাদে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা দাবি, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটিকে তাঁরা সাধুবাদ জানিয়েছেন। এতে করে তাঁদের শিক্ষাজীবন হুমকিরমুখ থেকে উদ্ধার হবে। কিন্তু সরকারি এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে আবারো কলেজটি চালুর অনুমতি দেওয়া হলে পুনরায় শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়বে তাঁদের।

বন্ধ ঘোষণার ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১১ এর শর্তসমূহপ্রতিপালন না করায় গত বছরের ১৯ মার্চ একটি রাজশাহী শাহমখদুম মেডিক্যাল কলেজটি পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের পর যেসকল বিষয়ে ঘাটতি পূরণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়, পরবর্তি পরিদর্শনের সময় সেসকল বিষয়গুলো বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এমনকি কর্তৃপক্ষের কোনো সদিচ্ছাও ছিল না। এই অবস্থায় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ হতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে কলেজ সূথ্র মতে, ২০১৪ সাল থেকে কলেজটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হলেও বিএমডিসির কোনো অনুমোদন ছিলো না। বর্তমানে সাতটি ব্যাচে ২২৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় কলেজটি বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন পায়নি। এ অবস্থায় গত ফেব্রæয়ারিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কলেজটি খোলা রাখা এবং বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান সাধীন বলেন, ‘সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কলেজের ৬০ হাজার বর্গফুট জায়গার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়নি কলেজে কতটুকু জায়গা আছে।

আবার বলা হয়েছে, গ্রন্থাগারের ২২০ জন শিক্ষার্থীর আসন ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। কতজনের ব্যবস্থা আছে তা বলা হয়নি। তিনি বলেন, কলেজের মোট শিক্ষার্থীই হচ্ছে ২২৫ জন। একইভাবে প্রত্যেক বিভাগে চার থেকে পাঁচজন করে শিক্ষক ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। কতজন শিক্ষক আছে তা বলা হয়নি। আমাদের ৪৪ জন স্থায়ী ও ২৪ জন খÐকালীন শিক্ষক দেখানো আছে।

মনিরুজ্জামান আরও বলেন, বিষয়টি পুনঃবিবেচনার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছেন। এ আদেশের ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আমি প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে আবেদন করে আদেশটি স্থগিত চাইবো।’

প্রসঙ্গত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিদর্শন শেষে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করার অনুমোদন দেয়। কিন্তু সেখানে ৫০জন শিক্ষার্থী ভর্তি করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে এই অনিয়ম রাবি কলেজ পরিদর্শকের নজরে আসার পর ২০১৬ সালে সেই সেশনের কার্যক্রম স্থগিত করা করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫-১৬ শেসনে অনুমতি ছাড়ায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করায় পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ কলেজটি ওই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত ছিল না। এরপর অধিভূক্ত করতে ওই সময় রাবি ভিসিকে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসেন রাজশাহীর-১ (তানোর-গোদাগাড়ী আসনের এমপি ফারুক চৌধূরী। বিনিময়ে তাঁকে কলেজটিতে শেয়ার দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত রাবির অধিভূক্তি লাভ করে কলেজটি। তবে বিএমডিসির অনুমোদন নিতে ব্যর্থ হয়।

পাবনার অভিভাবক মুক্তিঘোষ বলেন, ‘কলেজটি বন্ধ ঘোষণায় আমদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। কারণ দীর্ঘদিন বিএমডিসির অনুমতি না পাওয়ায় সন্তানদের ভবিশ্যত নিয়ে আমরা অভিভাবকরা চরম অনিশ্চিয়তায় ছিলাম। এখন অন্য কোনো অনুমদিত প্রতিষ্ঠানে মাইগ্রেশন হলে এ জটিলতা নিরসনা হবে। তাতে করে দুশ্চিন্তাও লাঘব হবে।’

এদিকে আন্দোলনের ডাক দেওয়া শিক্ষার্থী নিশাত তাসনীম বলেন, ‘শাহ মখদুম মেডিক্যাল কলেজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অন্যান্য বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। এতে খুশি হয়েছি আমরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সাধুবাদ জানায়।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য মেডিক্যালের মালিক পক্ষ বিভিন্ন চক্রান্ত করে যাচ্ছেন এবং পুনরায় শিক্ষার্থীদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন। এর প্রতিবাদে আমরা অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা রবিবার রাজশাহী জিরোপয়েন্ট মানববন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আর এই কলেজে থাকতে চাই না। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত মতে অন্য কলেজে মাইগ্রেশন করে পড়া-লেখা আবার শুরু করতে চাই। তা না হলে আমাদের ভবিষ্যত জীবন হুমকির মুখে পড়বে।’