সাভারে পৌর কাউন্সিলর মিনহাজ উদ্দিন মেল্লার নির্যাতনে অতিষ্ট এলাকাবাসী

জাহিন সিংহ, সাভার থেকে : কথায় আছে কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না। কথাটি যে কতটা সত্য, তা নিজের আচরণ দিয়ে ফের বুঝিয়ে দিলেন যুবদল থেকে ডিগবাজী দিয়ে আওয়ামী লীগে ভেরা সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিনহাজ উদ্দিন মোল্লা। পবিত্র রমজান মাসে রোজাদার নিরীহ এক ডাব বিক্রেতাকে পিটিয়েছেন প্রকাশ্যে। ডাব কাটার দা নিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশে তেড়ে গিয়েছেন।

এ ঘটনা গত বুধবারের। সাভারের নয়াবাড়ি মহল্লার সড়কে। নিরীহ সেই ডাব বিক্রেতা কুখ্যাত এই কাউন্সিলর ভয়ে এখন দিন কাটাচ্ছেন ভয়ে আর আতংকে।আর রোজা রেখে প্রতিনিয়ত অভিশাপ দিচ্ছেন এই কাউন্সিলরকে।

মানুষ খুন থেকে চাঁদাবাজী। বিএনপির হরতাল, অবরোধে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা থেকে জমি দখল – এমন অসংখ্য অভিযোগে সাবেক যুবদল নেতা মিনহাজ উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে আদালত ও সাভার মডেল থানায় মামলা রয়েছে এক ডজনের ওপরে। ২০১৭ সালের জুন মাসে সাভারের টেউটিতে প্রকাশ্য টেটাবিদ্ধ করে হত্যা করা হয় যুবলীগের কর্মী সি এম বাদশা ফয়সালকে।

পুলিশ সূত্রের খবর,এই ঘটনার পর প্রধান আসামী হিসেবে মিনহাজ উদ্দিন মোল্লার ওরফে মিনার নাম ওঠে ক্রস ফায়ারের তালিকায়।প্রাণ বাঁচাতে দীর্ঘ সময় ভারতে পালিয়ে থাকতে হয় এই কাউন্সিলরকে। রাজনৈতিক নেতাদের ধর্না ধরে দেশে ফিরে এসেও নিজেকে শোধরান নি এই কাউন্সিলর।

সাভার মডেল থানার তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী ও অপরাধীর বিষয়ে প্রতিবেদন দেবার পর-ও সে কি করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি পূর্ণবাসিত হচ্ছে এই নিয়েও খোদ প্রশ্ন রয়েছে আওয়ামী লীগে।

তাকে কে পূর্ণবাসন করছে? কে তার কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে কেঁচো খুড়তে সাপ। দ্বিতীয় স্ত্রী হত্যার দায়ে জেলে থাকা যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা সেলিম মন্ডলের হাত ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে নিজেকে পূর্ণবাসনের চেষ্টা চালায় এই মিনহাজ। সেখানেও সুবিধে করতে না পেরে এর ওর কাছে ভিরে ফেসবুকে ছবি দিয়ে নিজেকে জাহির করে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে।

তবে সাভার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাভার পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল গনি জানান,মিনহাজকে আওয়ামী লীগের কোন পদে নেয়া হয়নি। ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এরশাদুর রহমান রাজা হত্যাকান্ডে পলাতক থাকার সময় সে পদটি দখলের পায়ঁতারা করলেও তাকে সেখানে নেয়া হয় নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা.এনামুর রহমান এমপি জানান, আমি ফেসবুকে এক ডাব বিক্রেতার নির্যাতনের বর্ননা শুনেছি। একজন কাউন্সিলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দু:খজনক। তবে আমার সাফ কথা।কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যথাযথ ব্যব্স্থা নিতে।যদি ভয়ে ডাব বিক্রেতা মামলা নাও করে সেটার ব্যবস্থাও পরে হবে বলে জানান তিনি।

সাভারে জেলা যুবলীগের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিনহাজ উদ্দিন মোল্লাদের অনেকে কনডমের মতো ব্যবহার করছে মাত্র।কাজ শেষ,দায়ও শেষ।তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।

সে কেবল হাইব্রিডই নয়,বিএনপির আমলে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার আসামী।সে ছিলো যুবদলের নেতা। এ ছাড়াও যুবদলের আরেক নেতা সাজাপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক কাউন্সিলর খোরশেদ আলমের দেহরক্ষি।তার সাথে মিনহাজের যুবদলের সাংগঠনিক কর্মকান্ডের অনেক ছবি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও রয়েছে।তাকে দলে ভূক্তকরণ করা হলে সেটা হবে দলের জন্যে আত্নঘাতি। কারণ ত্যাগী নেতারা তখন দলে নিষ্কৃয় হয়ে যাবে।

সে কারনেই মুখে আওয়ামী লীগের জিগির তোলা মিনহাজ উদ্দিন মোল্লাকে আপাতত দলে অন্তর্ভূক্তকরণের সুযোগ-ও সংকুচিত হয়ে এসেছে। কারণ নেত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দলে বহিরাগত কাউকে ঠাইঁ দেয়া যাবে না।আর যারা মিনহাজকে শেল্টার দিচ্ছে তাদের তালিকাও করা হচ্ছে বলে জানান ওই নেতা।

সাভার মডেল থানার সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার সময়ে মিনহাজ উদ্দিন মোল্লা ওরফে মিনা ছিলো সাভার মডেল থানার তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী ও হত্যাকারী।তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াতে সে আমার বিরুদ্ধে নানা জায়গায় দরখাস্ত দিয়েও সুবিধা পায়নি।

তবে তার পাপের পাল্লা ভারী হচ্ছে। দেখবেন ফল-ও পাবে অচিরেই-যোগ করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি আরো বলেন, তার অতিত ও বর্তমান সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে একাধিক রিপোর্ট-ও পাঠানো রয়েছে।আমরা জানতে পেরেছি,সে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির ভুয়া সুপারিশ দেখিয়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা-ও করছে।

জমি দখল থেকে চাঁদাবাজী।সর্বত্রই জড়িয়ে আছে মিনহাজ উদ্দিনের নাম।কেন বার বার এসব অপকর্মে তার নাম উঠে আসছে- জানতে চাইলে মিনা বলেন,সবই ষড়যন্ত্রমূলক।কিন্তু আরো তো কাউন্সিলর আছেন। তাদের নাম তো সেভাবে আলোচনায় আসে না? তো আপনার নাম ঘুরে ফিরে কেন আসে?

‘আসলে আমার কপালডাই খারাপ।যেই মামলা গুলি আমার নামে দিছে সবই মিথ্যা আর ষড়যন্ত্রমূলক’- জানান মিনা।

এদিকে ইউনাইডেট কর্মাশিয়াল ব্যাংক সাভার শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,মিনা যে কত বড় বাটপার,সন্ত্রাসী আর চাঁদাবাজ- তা আমার নিরীহ বাবা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।তিনি বলেন,ওই এলাকায় জায়গা জমিতে যত ভেজাল নেপথ্যে রয়েছে মিনার হাত।

প্রশ্ন উঠেছে, এত বিতর্কিত হয়ে কি লাভ মিনার? একে তে নানা অসুখ বিসুখে আক্রান্ত। তার ওপর দাপট দেখিয়ে মানুষকে অত্যচার। বিশেষ করে রমজান মাসে একজন ডাব বিক্রেতাকে মারধর ও দা দিয়ে তেড়ে হত্যার চেষ্টায় সাভারে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে জনমনে।

বিষয়টি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও। জামসিং মহল্লার বাসিন্দা শামীম আহমেদ জানান,ফেসবুকে দেখলাম নিজের জন্মদিনে গাই গাইছেন মিনহাজ উদ্দিন মোল্লা। সেই মানুষ কি করে মানুষ খুন করে- সেটাই ভেবে পাই না।

আসলে হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল তো এমনই হয়।

এলাকাবাসী জানান, ওই ডাব বিক্রেতার অপরাধ তার মেয়ের জামাই বিদেশে মানুষ পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা করে নিরীহ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে সে গা ঢাকা দেয়। এই মিনহাজ উদ্দিনই সালিস করে জামাতাকে না পেয়ে তার শ্বশুড়কে দেড় লাখ টাকা জরিমানা দেবার রায় দিয়েছে।কিন্তু সেই ক্ষোভে রাস্তায় বসা অন্যান্য হকারদের কিছু না বলে বলে কেবল ডাব বিক্রেতাকে মারধর করাটা কেবল অন্যায়ই নয়,ক্ষমতার অপব্যবহার।

নয়াবাড়ির বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন জানান,মিনহাজের অত্যচার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।তার দাপটে অস্থির এলাকার নিরীহ মানুষ।

তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর কাছে বিচার দিসি।দেখি আল্লাহ এই জালেমরে কি শাস্তি দেয়।

হাফেজ সুফিয়ান ফারাবী নামের স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, জনপ্রতিনিধি হলেও মিনহাজ উদ্দিন এক অর্থে বধির, মূক ও অন্ধ : কারন মুনাফিকরা হক কথা শোনার ব্যাপারে বধির, তারা হক কথা শোনে না, সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক ও বোবা এবং সত্য কথা বলে না।

সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার ব্যাপারে অন্ধ। মহান আল্লাহ তাআলা মিনহাজদের মতো সুবিধাভোগীদের অবস্থা বর্ণনা করেন, ‘তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। তারা (হকের দিকে) আদৌ ফিরে আসবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮)

তবে কি মিনহাজ উদ্দিন মিনা আদৌ ভালো হবে না। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করবে না। নাকি দাপট দেখিয়ে যাকে তাকে মারবে।

এই প্রশ্নের উত্তরে ওই হাফেজ আরো বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম।এই পবিত্র রমজানের প্রথম ১০ দিন হলো রহমতের।আর এর মধ্যে সে একজন রোজাদারকে মারপিট করে মুনাফিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

সামাজিক শান্তির বিরোধিতা করে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার কারণে সেটা অনুভব করতে পারছে না।এই শ্রেনীর মানুষদের জন্যে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তাদের সে অনুভূতি নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২)

সাভার মডেল থানা পুলিশের রেকর্ড বলছে,২০১৩ সালেও যুবদলের নেতা হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছিলো এই মিনহাজ উদ্দিন মোল্লা ওরফে মিনা। তার বিরুদ্ধে সাভার থানা ও আদালতে তখন মামলা ছিলো ৬টি ।অধিকাংশ মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছিলো।

দিন যায়। ডিগবাজী দিয়ে রাজনীতির ভোল পাল্টালেও মিনহাজ উদ্দিন পাল্টায়নি তার স্বভাব।যে কারনে মামলা হত্যা,চাঁদাবাজী,নাশকতাসহ মিনহাজ উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা এখন এক ডজন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান জানান,অপেক্ষা করেন। সন্ত্রাসী সে যত বড়ই হোক রেহাই পাবে না। আর মিনহাজ উদ্দিনের বিষয়ে আমাদের নজর আছে। সময় মতোই ফল পাবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ,অপরাধ করলে কেউ পার পাবে না।বিচারের আওতায় আসতেই হবে।

মিনহাজ উদ্দিন মিনা কি তবে সেই পরিণতির অপেক্ষাতেই থাকবে নাকি ভালো মানুষ হবে? সময়ই বলে দেবে সবকিছু।